সমাজতন্ত্র: গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্র
লেখকের প্রস্তাব: বর্তমান অনুচ্ছেদ ১০-কে পাঁচ দফায় সম্প্রসারণ, যাতে সমাজতন্ত্র নাম দিয়ে নয়, কাজ দিয়ে চেনা যায়। প্রতিটি দফার জন্য ভিত্তিমান, লক্ষ্য আর সময়সীমা থাকবে সাধারণ আইনে।
কেন নিয়ন্ত্রণ নয়, রূপান্তর: "মানবিক পুঁজিবাদ" কি সম্ভব?
প্রস্তাবিত সাংবিধানিক পাঠ (বর্তমান অনুচ্ছেদ ১০-এর সম্প্রসারণ):
রাষ্ট্র মানুষের উপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করিবে, যাহার অন্তর্ভুক্ত হইবে—
(ক) জীবনধারণের পাঁচ মৌলিক প্রয়োজন — অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসা — এবং নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ আইনে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে সকলের জন্য নিশ্চিত করা; ইহার মধ্যে ক্ষুধা ও খোলা আকাশের নিচে বাস হইতে মুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক শিক্ষা প্রত্যেক ব্যক্তির অবিলম্বে প্রাপ্য হইবে; খাদ্য-নিরাপত্তা ও আবাসনের জন্য রাষ্ট্র আইনের দ্বারা কর্মসূচি প্রতিষ্ঠা করিবে; এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি ও বিদ্যুৎ জনস্বার্থে সামাজিক নিয়ন্ত্রণে রাখা;
(খ) ভূমি সংস্কার, প্রগতিশীল কর এবং আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সম্পদের কেন্দ্রীভবন রোধ;
(গ) বহুদলীয় গণতন্ত্র ও মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখিয়া কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশগ্রহণ;
(ঘ) উৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিগত মালিকানার সমন্বয়, এবং সমবায় ও সামাজিক মালিকানার বিকাশে রাষ্ট্রীয় উৎসাহ ও সহায়তা;
(ঙ) পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন।
রাষ্ট্র আইনের দ্বারা এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য পূরণের পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা ও সময়সীমা নির্ধারণ করিবে, প্রতি বৎসর তাহার অগ্রগতি প্রকাশ করিবে, লক্ষ্যমাত্রা পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব ও বরাদ্দের পরিকল্পনা বার্ষিক বাজেটের সহিত সংসদে উপস্থাপন করিবে, এবং লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হইলে সংসদে উহার কারণ ব্যাখ্যা করিবে।
এটি কোন সমাজতন্ত্র নয়, তা-ও স্পষ্ট করা দরকার। চীন বা ভিয়েতনামে দারিদ্র্য দ্রুত কমেছে, কিন্তু একদলীয় শাসনে মানবিক মর্যাদা আর গণতন্ত্রের যে অভাব, তা তিন লক্ষ্যের সঙ্গে মেলে না; দক্ষিণ কোরিয়া ভূমি সংস্কার (১৯৪৯–৫০) আর শিক্ষা দিয়ে বৈষম্য কম রেখেছিল, কিন্তু উচ্চ প্রবৃদ্ধির প্রথম দুই দশক কেটেছে সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতায় আসা কর্তৃত্ববাদী শাসনে (১৯৬১–৭৯); গণতন্ত্র আসে ১৯৮৭-এর গণআন্দোলনের পর।১ নরওয়ে বা সুইডেন সমাজতন্ত্র নয়, সামাজিক গণতন্ত্র (পার্থক্য কোথায়)। লেখকের প্রস্তাব তাই সমাজতন্ত্র আর গণতন্ত্র, একসঙ্গে।
সমবায় নিয়ে একটা সৎ স্বীকারোক্তি। বাংলাদেশে সমবায়ের পরীক্ষা আগেই হয়েছে, আর তা খুব সফল হয়নি। আখতার হামিদ খান ১৯৫৯ সালে কুমিল্লায় যে সমবায় মডেল শুরু করেছিলেন, ছোট পরিসরে তা কাজ করেছিল; কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে ছড়ানোর পর জালিয়াতি, গ্রামীণ প্রভাবশালীদের দখল আর সরকারি ঋণের ওপর নির্ভরতায় ভেঙে পড়ে। ১৯৭৯ নাগাদ কুমিল্লার ৪০০ সমবায়ের মধ্যে চালু ছিল মাত্র ৬১টি।২
বিপরীত দৃষ্টান্ত স্পেনের বাস্ক অঞ্চলের মন্দ্রাগন। ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া এই শ্রমিক-সমবায় গোষ্ঠীর ২০২৫ সালে বিক্রি ছিল ১১.৩২ বিলিয়ন ইউরো, কর্মী ৭১ হাজারের বেশি; ২০১৬ সালের হিসাবে সর্বোচ্চ আর সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত ছিল প্রায় ৯:১, যেখানে স্পেনে সার্বিকভাবে তা প্রায় ১২৭:১।৩ মন্দ্রাগন টিকেছে সহায়ক প্রতিষ্ঠানের জোরে: নিজস্ব সমবায় ব্যাংক, শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, আর সংকটে এক সমবায় থেকে আরেক সমবায়ে কর্মী স্থানান্তর। কুমিল্লায় এই সহায়ক কাঠামো ছিল না।
মন্দ্রাগনের সীমাবদ্ধতাও সৎভাবে দেখা দরকার। ২০১৩ সালে গোষ্ঠীর পতাকাবাহী সমবায় ফাগোর ইলেকট্রোডোমেস্টিকোস দেউলিয়া হয়; সদস্যদের অন্য সমবায়ে সরানো হলেও সহায়ক প্রতিষ্ঠানের প্রায় সাড়ে তিন হাজার কর্মী সেই সুরক্ষা পাননি। বিদেশে মন্দ্রাগনের প্রায় একশো সহায়ক প্রতিষ্ঠান শ্রমিক-মালিকানাধীন নয়; মোট কর্মীর মাত্র প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমবায়ের সদস্য।৪ অর্থাৎ পুঁজিবাদী বাজারে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে সেরা সমবায়ও ধীরে ধীরে পুঁজিবাদী আচরণ গ্রহণ করে — লেখকের “মানবিক পুঁজিবাদ টেকসই নয়” যুক্তিরই আরেক প্রমাণ।
দুই শিক্ষা থেকে প্রস্তাব: সমবায় হবে রাষ্ট্রের উৎসাহে, রাষ্ট্রের হুকুমে নয় — ইতালির সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৪৫-এর মতো, যা সমবায়ের সামাজিক ভূমিকা স্বীকার করে আইনের মাধ্যমে তাকে উৎসাহিত করে।৫ সঙ্গে থাকবে সমবায় ব্যাংক, সমবায় ফেডারেশন আর শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠান কিনে নেওয়ার আইনি সুযোগ; আর প্রভাবশালীদের দখল ঠেকাতে স্বচ্ছ নির্বাচন ও নিরীক্ষা।
সাধারণ আইনের জন্য উদাহরণমূলক লক্ষ্যমাত্রা (“সাম্য ও মৌলিক প্রয়োজন আইন”):
নিচের সংখ্যাগুলো সংবিধানের জন্য নয়, সাধারণ আইনের জন্য উদাহরণ। চূড়ান্ত সংখ্যা ঠিক করবে সংসদ। প্রথমে পুরো অনুচ্ছেদের সামগ্রিক ফল, তারপর প্রতিটি দফা আলাদাভাবে পাঁচ মানদণ্ডে।
| সূচক | সর্বশেষ মান | ৫ বছর | ১০ বছর | ২৫ বছর |
|---|---|---|---|---|
| আয়-বৈষম্যের জিনি সহগ | ০.৪৯৯ (২০২২)৬ | ০.৪৫ | ০.৪০ | ০.৩০ |
| নিচের অর্ধেক পরিবারের আয়ের ভাগ | ১৮% (২০২২) | ২২% | ২৬% | ৩০% |
পাঁচ মানদণ্ডে (SMART) সমাজতন্ত্র
৪.২-এর শুরুতে প্রস্তাবিত অনুচ্ছেদের শেষ বাক্য রাষ্ট্রকে “পরিমাপযোগ্য লক্ষ্যমাত্রা” ঠিক করতে বাধ্য করে। নিচে দেখানো হলো, প্রতিটি দফার জন্য সেই লক্ষ্যমাত্রা কেমন হতে পারে। প্রতিটি দফায় SMART-এর পাঁচ অক্ষর আলাদা করে চিহ্নিত: S (সুনির্দিষ্ট), M (পরিমাপযোগ্য), A (অর্জনযোগ্য), R (প্রাসঙ্গিক) আর T (সময়সীমাবদ্ধ); সারণিতে M মানে সূচক, T মানে সময়সীমার লক্ষ্য। প্রতিটি দফায় দুই ধরনের সূচক আছে: - প্রক্রিয়ার সূচক: রাষ্ট্র কী করল, যেমন বরাদ্দ, আইন বা প্রতিষ্ঠান। - ফলের সূচক: মানুষের জীবনে কী বদলাল।
শুধু ফল মাপলে ব্যর্থতার দায় কার, তা ধরা কঠিন। শুধু প্রক্রিয়া মাপলে কাগুজে সাফল্য দেখানো সহজ।
কোনো সূচকে দুটি সরকারি বা আন্তর্জাতিক হিসাব আলাদা হলে দুটোই দেওয়া হয়েছে। আইনে একটি নির্দিষ্ট হিসাবকে মাপকাঠি হিসেবে ঠিক করে দিতে হবে।
দফা (ক): পাঁচ মৌলিক প্রয়োজন, নিরাপদ পানি ও বিদ্যুৎ
- S — সুনির্দিষ্ট (Specific): অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপদ পানি আর বিদ্যুৎ সবার নাগালে, এক সংসদীয় মেয়াদে। চারটি ন্যূনতম (ক্ষুধা আর খোলা আকাশের নিচে বাস থেকে মুক্তি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, প্রাথমিক শিক্ষা) এক বছরে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পানি আর বিদ্যুৎ সামাজিক নিয়ন্ত্রণে।
- M — পরিমাপযোগ্য (Measurable): নিচের সারণির সূচক, দুই ধরনের: প্রক্রিয়া আর ফল। প্রতিটি প্রয়োজনে অন্তত একটি ফলের সূচক; যেখানে ফল দেরিতে বদলায় (শিশুর খর্বতা, মাধ্যমিক সমাপন), সেখানে সেবা সবার কাছে পৌঁছানোর প্রক্রিয়ার সূচকও।৭
- A — অর্জনযোগ্য (Achievable): চরম দারিদ্র্য ২০১০ থেকে ২০২২-এ ১৭.৬% থেকে ৫.৬%-এ নেমেছে,৮ অর্থাৎ বারো বছরে প্রায় বারো বিন্দু। পাঁচ বছরে বাকিটুকু শূন্যে নামানো সেই গতির চেয়ে দ্রুত; সম্ভব কেবল অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি থাকলে (সারণির পরে)।
- R — প্রাসঙ্গিক (Relevant): সাম্য আর মানবিক মর্যাদা (অনুচ্ছেদ ১৫)।
- T — সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound): এক বছর (চার ন্যূনতম), পাঁচ বছর (“সবার”)। অগ্রগতি প্রতি বছর প্রকাশ; পূর্ণ মূল্যায়ন মেয়াদের শেষে, পরের নির্বাচনের আগে, সংসদে।
কেন এক মেয়াদ। যে সরকার দায়িত্ব নেবে, সেই সরকারই হিসাব দেবে: নির্বাচনের সময় ভোটার সরাসরি জিজ্ঞেস করতে পারবেন, “সবার” হলো কি না। দীর্ঘ সময়সীমায় প্রতিটি সরকার দায় পরের সরকারের ঘাড়ে ঠেলে দেয়, আর আজকের অপুষ্ট শিশু লক্ষ্য পূরণের আগেই বড় হয়ে যায়। “সবার” মানে অনেক সূচকে ঠিক ১০০% নয়, কারণ জরিপের ভুল আর অস্থায়ী পরিস্থিতি থাকে; আইন প্রতিটি সূচকে “সর্বজনীন” কত, তা সংজ্ঞায়িত করবে। পাঁচ বছরের সংখ্যা সংবিধানে নয়, আইনে।
| প্রয়োজন | সূচক (M) | ধরন | সর্বশেষ মান | ১ বছর (T) | ৫ বছর, “সবার” (T) |
|---|---|---|---|---|---|
| অন্ন | তীব্র খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতা | ফল | ০.৮৩% খানা (২০২৩; বিবিএস); এফএও-র হিসাবে জনসংখ্যার ১১.৪% (সফি ২০২৪)৯ | জরুরি খাদ্য সহায়তার আইনি নিশ্চয়তা | শূন্য |
| অন্ন | মাঝারি বা তীব্র খাদ্য-নিরাপত্তাহীনতা | ফল | ২১.৯% (২০২৩; বিবিএস); এফএও-র হিসাবে ২৬.২% (২০২৩–২৫) | — | ৩%-এর নিচে |
| অন্ন | গর্ভবতী নারী আর দুই বছরের কম বয়সী শিশুর পুষ্টি-কর্মসূচির আওতা | প্রক্রিয়া | আওতার হার সরকারিভাবে প্রকাশিত নয়; মা ও শিশু সহায়তা কর্মসূচির উপকারভোগী ১৮.৯৫ লাখ (২০২৬-২৭); গর্ভকালে অন্তত ৯০ দিন আয়রন-ফলিক অ্যাসিড পেয়েছেন ৫৩% নারী (২০২২)১০ | যোগ্য মোট সংখ্যা আর আওতার হার প্রকাশ | সবার |
| অন্ন | পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর খর্বতা | ফল | ২৪.০% (২০২৫; মিকস, প্রাথমিক) | — | ১২% (শূন্য করা পাঁচ বছরে জৈবিকভাবে সম্ভব নয়; “সবার” লক্ষ্য ওপরের সারিতে) |
| বস্ত্র ও সামগ্রিক | মৌলিক চাহিদাভিত্তিক দারিদ্র্যহার; চরম দারিদ্র্য | ফল | ১৮.৭%; ৫.৬% (২০২২; খানা আয়-ব্যয় জরিপ) | — | ৩%-এর নিচে; শূন্য |
| আশ্রয় | ভাসমান মানুষ | ফল | ২২,১৮৫ (জনশুমারি ২০২২, প্রাথমিক; প্রকৃত সংখ্যা সম্ভবত বেশি) | পূর্ণ গণনা; সবার জন্য জরুরি আশ্রয়কেন্দ্রে জায়গা | শূন্য (সবার স্থায়ী আশ্রয়) |
| আশ্রয় | কাঁচা ঘর বা ঝুপড়িতে বাস করা খানা | ফল | কাঁচা ঘর ৫৩% (২০১৬-১৭-এর তথ্য; বিবিএস)১১ | জনশুমারি ২০২২-এর হালনাগাদ হার প্রকাশ | অর্ধেক |
| শিক্ষা | প্রাথমিক স্তরে নিট উপস্থিতি | ফল | ৮৫.০% (২০২৫; মিকস)১২ | সবার (অবিলম্বে প্রাপ্য) | সবার |
| শিক্ষা | স্কুলের বাইরে থাকা মাধ্যমিক বয়সী শিশুকে ফিরিয়ে আনার কর্মসূচি | প্রক্রিয়া | কর্মসূচির আওতার হিসাব নেই; স্কুলের বাইরে: নিম্ন মাধ্যমিক বয়সী ১৩.১%, উচ্চ মাধ্যমিক বয়সী ৩৩.৯% (২০২৫; মিকস)১৩ | কর্মসূচি চালু | সবার আওতায় |
| শিক্ষা | মাধ্যমিক সমাপনের হার: নিম্ন; উচ্চ | ফল | ৬৯.৩%; ৪৩.৮% (২০২৫; মিকস, প্রাথমিক) | — | ৯০%; ৬৫% (ফল দেরিতে বদলায়; “সবার” লক্ষ্য ওপরের সারিতে) |
| শিক্ষা | ৭–১৪ বছর বয়সী শিশুর মৌলিক পড়া; মৌলিক অঙ্কের দক্ষতা | ফল | ৫০.২%; ৩৯.২% (২০২৫; মিকস)১৪ | — | লক্ষ্য আইনে |
| শিক্ষা | জিডিপির অনুপাতে সরকারি শিক্ষা ব্যয় | প্রক্রিয়া | ২.০৩% (২০২৪; ইউনেস্কো); বাজেট বরাদ্দ ১.৩৯% (২০২৫-২৬) | — | ৬% |
| চিকিৎসা | ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা | প্রক্রিয়া | কমিউনিটি ক্লিনিক ১৪,৪৬০টি চালু; ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসকের ৩,১৬৭টি অনুমোদিত পদের ১,৭০৭টি শূন্য (জুন ২০২৬)১৫ | আইনি নিশ্চয়তা; শূন্য পদ পূরণের সময়সূচি | সবার |
| চিকিৎসা | স্বাস্থ্য ব্যয়ে নিজের পকেট থেকে দেওয়া অংশ | ফল | ৭৯.৩% (২০২৩; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা); জাতীয় স্বাস্থ্য হিসাবে ৬৮.৫% (২০২০) | — | ২৫% |
| চিকিৎসা | জিডিপির অনুপাতে সরকারি স্বাস্থ্য ব্যয় (প্রকৃত ব্যয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাপে) | প্রক্রিয়া | ০.৩১% (২০২৩; বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা); বাজেট বরাদ্দ ২০২৫-২৬-এ ০.৫৮%, ২০২৬-২৭-এ ১.০২%১৬ | — | ৩% |
| নিরাপদ পানি | ঘরে বা আঙিনায়, প্রয়োজনের সময়, জীবাণু ও আর্সেনিকমুক্ত (সরকারি মান) পানি পাওয়া মানুষ | ফল | ৩৯.৩% (২০২৫; মিকস, প্রাথমিক); জেএমপি-র হিসাবে ৫৯.১% (২০২৪) | — | সবার (৯৫%+) |
| নিরাপদ পানি | সরকারি মানের (৫০ পিপিবি) বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানির উৎসে নির্ভর মানুষ | ফল | ৯.৯% (২০২৫; মিকস, প্রাথমিক) | — | শূন্য |
| বিদ্যুৎ | সংযোগ | ফল | ৯৯.৫% (২০২৪; বিশ্বব্যাংক) | সবার | সবার |
| বিদ্যুৎ | লোডশেডিংয়ের বার্ষিক সরকারি হিসাব | প্রক্রিয়া | নিয়মিত সরকারি হিসাব নেই; জুন ২০২৬-এ সর্বোচ্চ চাহিদার সময় ২,০০০–৩,০০০ মেগাওয়াট ঘাটতি (পিজিসিবি, সংবাদমাধ্যমে) | দৈনিক তথ্য প্রকাশ | পিক-আওয়ারে লোডশেডিং বন্ধ |
| বিদ্যুৎ | উৎপাদন সক্ষমতায় রাষ্ট্রীয় মালিকানার ভাগ | প্রক্রিয়া | ৪১.৮% (৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৩; পিডিবি) | — | অন্তত ৫০% (রাষ্ট্রীয় ও সমবায়ী মিলিয়ে) |
দফা (ক)-এর তিনটি সৎ সীমা।
- কিছু ফল পাঁচ বছরে পুরো বদলায় না। শিশুর খর্বতা জন্মের পর প্রথম দুই বছরের পুষ্টির ফল; মাধ্যমিক সমাপনের হার মাপে যারা এখন সেই বয়সী, তাদের। এসব ক্ষেত্রে “সবার” লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে সেবার আওতার সূচকে, আর ফলের সূচকে বাস্তবসম্মত অগ্রগতি। কাঁচা ঘরের লক্ষ্যও “অর্ধেক”, কারণ তা বর্তমানে প্রায় অর্ধেক খানার বাসস্থান; আশ্রয়ের “সবার” লক্ষ্য ভাসমান মানুষ শূন্যে।
- অর্থায়ন। শুধু শিক্ষা আর স্বাস্থ্যে সরকারি ব্যয় ওপরের লক্ষ্যে তুলতে পাঁচ বছরে জিডিপির প্রায় ৬.৭ শতাংশ বিন্দু বাড়তি ব্যয় লাগবে, অর্থাৎ বর্তমান কর-জিডিপি অনুপাত প্রায় দ্বিগুণ করতে হবে। লেখকের রাজস্ব-পথের প্রস্তাব (প্রতি মেয়াদে দুই থেকে তিন বিন্দু) এর তুলনায় অনেক কম। তাই এই লক্ষ্য টিকবে তিনটি শর্ত একসঙ্গে মিললে: প্রত্যক্ষ কর আর সম্পদ-কর থেকে রাজস্বে দ্রুত উল্লম্ফন (দফা (খ)), বাজেটের অগ্রাধিকার বদল, আর প্রতি টাকায় সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার হয় এমন খাত (প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, পানি, পুষ্টি) আগে।
- পাঁচ মানদণ্ডের “অর্জনযোগ্য” শর্তের সঙ্গে টানাপোড়েন। অর্থায়ন ছাড়া পাঁচ বছরের লক্ষ্য কাগজে থাকবে, আর বছর শেষে ব্যর্থতাই স্বাভাবিক হয়ে যাবে। এই কারণেই প্রস্তাবিত অনুচ্ছেদের শেষ বাক্য বাজেটের সঙ্গে রাজস্ব ও বরাদ্দের পরিকল্পনা সংসদে আনা বাধ্যতামূলক করে। “অবিলম্বে প্রাপ্য” চার ন্যূনতমের ক্ষেত্রে আদালতের প্রতিকার আসবে জবাবদিহি কাঠামোর শর্তসাপেক্ষ বলবৎযোগ্যতা দিয়ে; তবে সেখানেই বলা গ্রুটবুম মামলার শিক্ষা মনে রেখে, ভরসা আদালত একা নয়, পর্যবেক্ষণ কমিশনের তদারকিও।
দফা (খ): ভূমি সংস্কার, প্রগতিশীল কর, সম্পদ-কেন্দ্রীভবন রোধ
- S — সুনির্দিষ্ট (Specific): খাসজমি ভূমিহীনের হাতে; করের বোঝা সামর্থ্য অনুযায়ী; আইনে নির্ধারিত সীমার বেশি সম্পদ-কেন্দ্রীভবন রোধ।
- M — পরিমাপযোগ্য (Measurable): নিচের সারণির সূচক, দুই ধরনের: প্রক্রিয়া আর ফল।১৭
- A — অর্জনযোগ্য (Achievable): কর-জিডিপি অনুপাতের লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার তুলনীয় দেশের স্তরে।
- R — প্রাসঙ্গিক (Relevant): সাম্য, আর এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্য।
- T — সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound): সর্বশেষ মান থেকে ৫ ও ১০ বছরের লক্ষ্য; অগ্রগতি প্রতি বছর প্রকাশ, পূর্ণ মূল্যায়ন প্রতি পাঁচ বছরে সংসদে।
| সূচক (M) | ধরন | সর্বশেষ মান | ৫ বছর (T) | ১০ বছর (T) |
|---|---|---|---|---|
| কর-জিডিপি অনুপাত (জাতীয় রাজস্ব বোর্ড) | প্রক্রিয়া | ৬.৬% (২০২৪-২৫) | ১০% | ১৫% |
| রাজস্ব বোর্ডের আয়ে প্রত্যক্ষ করের ভাগ | প্রক্রিয়া | ৩৪.৪% (জুন ২০২৬-এর প্রতিবেদন) | ৪৫% | ৫০% |
| শীর্ষ ৫% খানার আয়ের ভাগ | ফল | ৩০.৪% (২০২২; খানা আয়-ব্যয় জরিপ) | ২৭% | ২৪% |
| কৃষি খাসজমি: পূর্ণ তালিকা আর ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ | প্রক্রিয়া | সর্বশেষ সরকারি হিসাব ২০২০-২১-এর, আর দুই সূত্রে পরস্পরবিরোধী | পূর্ণ তালিকা প্রকাশ (১ বছরে); বিতরণযোগ্য জমির অর্ধেক বিতরণ | সবটুকু বিতরণ |
| একেবারে ভূমিহীন গ্রামীণ খানা | ফল | ৭.৮৪% (কৃষিশুমারি ২০১৯) | পরের শুমারিতে কমা | অর্ধেক |
সম্পূরক তথ্য (সূচক হিসেবে নয়): ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি ডেটাবেসের প্রাক্কলনে শীর্ষ ১ শতাংশের হাতে জাতীয় আয়ের প্রায় ১৬ আর সম্পদের প্রায় ২৪ শতাংশ (২০২৪)। এগুলো মডেলভিত্তিক প্রাক্কলন, মাপা প্রবণতা নয়। তাই লেখকের প্রস্তাব, সম্পদের বণ্টন মাপতে বিবিএস নিয়মিত সম্পদ জরিপ করবে।
দফা (গ): কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের অংশগ্রহণ
- S — সুনির্দিষ্ট (Specific): কর্মক্ষেত্রের সিদ্ধান্তে শ্রমিকের সংগঠিত কণ্ঠ, বহুদলীয় গণতন্ত্র আর মৌলিক অধিকার অক্ষুণ্ণ রেখে।
- M — পরিমাপযোগ্য (Measurable): নিচের সারণির সূচক, দুই ধরনের: প্রক্রিয়া আর ফল।১৮
- A — অর্জনযোগ্য (Achievable): শ্রম আইনে অংশগ্রহণ কমিটির বিধান আগে থেকেই আছে। শুরু সেখান থেকে।
- R — প্রাসঙ্গিক (Relevant): সাম্য (মজুরি আর আয়ের বণ্টন) আর মর্যাদা (শ্রমিক “হাত” নন, অংশীদার)।
- T — সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound): সর্বশেষ মান থেকে ৫ ও ১০ বছরের লক্ষ্য; অগ্রগতি প্রতি বছর প্রকাশ, পূর্ণ মূল্যায়ন প্রতি পাঁচ বছরে সংসদে।
| সূচক (M) | ধরন | সর্বশেষ মান | ৫ বছর (T) | ১০ বছর (T) |
|---|---|---|---|---|
| ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য, মোট কর্মচারীর শতাংশ | ফল | ১১.৯% (২০১৮; আইএলও) | ২০% | ৩০% |
| যৌথ দরকষাকষি চুক্তির আওতায় কর্মচারী | ফল | ১.৬% (২০২০; আইএলও) | ১০% | ২৫% |
| ৫০ বা তার বেশি শ্রমিকের প্রতিষ্ঠানে সক্রিয় অংশগ্রহণ কমিটি (শ্রম আইন, ধারা ২০৫) | প্রক্রিয়া | সরকারি তথ্য নেই | সব প্রতিষ্ঠানের তালিকা প্রকাশ, অর্ধেকে সক্রিয় | সবগুলোতে সক্রিয় |
| বড় প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদে নির্বাচিত শ্রমিক প্রতিনিধি | প্রক্রিয়া | আইনে বিধান নেই | আইন প্রণয়ন | আইনের আওতাভুক্ত সব প্রতিষ্ঠানে কার্যকর |
দফা (ঘ): মালিকানার সমন্বয়, সমবায় ও সামাজিক মালিকানা
- S — সুনির্দিষ্ট (Specific): উৎপাদনশীল খাতে রাষ্ট্রীয়, সমবায়ী ও ব্যক্তিগত মালিকানা পাশাপাশি; সমবায় হবে রাষ্ট্রের উৎসাহে, হুকুমে নয়। রাষ্ট্র দেবে ঋণ, প্রশিক্ষণ, বাজারে প্রবেশাধিকার আর সরকারি ক্রয়ে অগ্রাধিকার।
- M — পরিমাপযোগ্য (Measurable): নিচের সারণির সূচক, দুই ধরনের: প্রক্রিয়া আর ফল।১৯
- A — অর্জনযোগ্য (Achievable): সমবায় আজও বড় আকারে আছে, ঘাটতি তথ্যে আর মানে।
- R — প্রাসঙ্গিক (Relevant): সাম্য। মালিকানা শ্রমিক আর উৎপাদকের হাতে যায়, আমলার হাতে নয়।
- T — সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound): সর্বশেষ মান থেকে ৫ ও ১০ বছরের লক্ষ্য; অগ্রগতি প্রতি বছর প্রকাশ, পূর্ণ মূল্যায়ন প্রতি পাঁচ বছরে সংসদে।
| সূচক (M) | ধরন | সর্বশেষ মান | ৫ বছর (T) | ১০ বছর (T) |
|---|---|---|---|---|
| নিবন্ধিত সমবায় সমিতি; সদস্য | ফল | ১,৭৭,৫৯২ সমিতি; ১ কোটি ২৪ লাখ সদস্য (২০২৪; সমবায় অধিদপ্তর, সংবাদমাধ্যমে) | সক্রিয় সমিতির হিসাব আলাদা প্রকাশ | — |
| সমবায়ে কর্মসংস্থান | ফল | এখনো নির্ধারিত হয়নি (দুই সরকারি হিসাব ১১.৪ লাখ আর ১৬ লাখ) | একক সরকারি হিসাব; বৃদ্ধি | মোট কর্মসংস্থানে ভাগ দ্বিগুণ |
| জাতীয় উৎপাদনে সমবায় ও সামাজিক মালিকানার ভাগ | প্রক্রিয়া | জাতীয় হিসাবে আলাদা দেখানো হয় না | জাতীয় হিসাবে আলাদা খাত হিসেবে প্রকাশ | ভাগ বৃদ্ধি (ভিত্তিমানের পর সংখ্যা) |
| সমবায়ে রাষ্ট্রীয় ঋণ ও সহায়তা | প্রক্রিয়া | সরকারি তথ্য নেই | বাজেটে আলাদা খাত | — |
দফা (ঙ): পরিবেশ সুরক্ষা ও টেকসই উন্নয়ন
- S — সুনির্দিষ্ট (Specific): বায়ু, বন আর জ্বালানিতে মাপযোগ্য উন্নতি; উন্নয়নের খরচ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ঘাড়ে না চাপানো।
- M — পরিমাপযোগ্য (Measurable): নিচের সারণির সূচক, দুই ধরনের: প্রক্রিয়া আর ফল।২০
- A — অর্জনযোগ্য (Achievable): লক্ষ্য ধাপে ধাপে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকার দিকে।
- R — প্রাসঙ্গিক (Relevant): মানবিক মর্যাদা আর সুবিচার। দূষণের বোঝা সবচেয়ে বেশি পড়ে দরিদ্রের ওপর।
- T — সময়সীমাবদ্ধ (Time-bound): সর্বশেষ মান থেকে ৫ ও ১০ বছরের লক্ষ্য; অগ্রগতি প্রতি বছর প্রকাশ, পূর্ণ মূল্যায়ন প্রতি পাঁচ বছরে সংসদে।
| সূচক (M) | ধরন | সর্বশেষ মান | ৫ বছর (T) | ১০ বছর (T) |
|---|---|---|---|---|
| বায়ুতে বার্ষিক গড় পিএম২.৫ | ফল | ৬৬.১ মাইক্রোগ্রাম/ঘনমিটার, বিশ্বে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ (২০২৫; আইকিউএয়ার) | ৪৫ | ৩৫ |
| মোট ভূমিতে বনভূমি | ফল | ১৪.৪% (২০২৪; এফএও/বিশ্বব্যাংক) | ১৬% | ২০% |
| বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতায় নবায়নযোগ্যের ভাগ | প্রক্রিয়া | ৫.৬% (জুলাই ২০২৬; স্রেডা) | ২০% | ৩০% |
প্রগতিশীল করের দিক: বর্তমানে ব্যক্তির সর্বোচ্চ আয়করের হার ৩০ শতাংশ; নিট সম্পদের ওপর সারচার্জ আছে; কর-জিডিপি অনুপাত সাত শতাংশেরও কম (২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৬.৮ শতাংশ), যা দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যেও কম।২১ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট সবচেয়ে নিচের করধাপ ৫ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করেছে, অথচ সর্বোচ্চ হার আপাতত ৩০ শতাংশেই রেখেছে (৩ কোটি টাকার বেশি আয়ে ৩৫ শতাংশের প্রস্তাব কার্যকর হবে ২০২৮-২৯ থেকে), আর পরিকল্পিত সম্পদ কর স্থগিত রেখেছে — বোঝার ভার নিচে, প্রগতিশীলতার উল্টো দিকে। আইনে লক্ষ্য থাকবে: রাজস্বে প্রত্যক্ষ করের অংশ বাড়ানো, সর্বোচ্চ আয় ও সম্পদে কার্যকর কর, আর উত্তরাধিকার সূত্রে বিপুল সম্পদ হস্তান্তরে কর। কত হার, তা আইন আর অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের বিষয়; পুঁজি পাচারের ঝুঁকিও সেখানে বিবেচনায় নিতে হবে।